সিরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে তুরস্ক প্রস্তাবিত সেফ জোন তৈরির জন্য পরিচালিত সামরিক অভিযান অপারেশন অপারেশন পিস স্প্রিং এ কিছু শর্তে সাময়িক বিরতি দিতে সম্মত হয়েছে প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান। উল্লেখযোগ্য শর্তগুলো হলো ১২০ ঘন্টার মধ্যে সিরিয়ার কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠী ওয়াইপিজি সেফ জোন থেকে সরে যাবে। আমেরিকা তাদেরকে আর সামরিক সহায়তা দিবে না। তুরস্ক প্রস্তাবিত সেফ জোন মেনে নেওয়া। সেফ জোন তুরস্কের সামরিক বাহিনীর অধীনে থাকবে।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান ও আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সের মধ্যে অনুষ্ঠিত দীর্ঘ বৈঠকের পর উভয় দেশ শর্তগুলো তে সম্মত হয়। এর মাধ্যমে অপারেশন পিস স্প্রিংয়ের একটি সমাপ্তি হলো বলে ধরে নেয়া যায়। যদিও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বৈঠক পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন পুরোপুরি সমাপ্তি তখনই হবে যখন শর্তগুলো কার্যকর করা হবে। আপাতত ১২০ ঘণ্টার বিরতি থাকবে। তুরস্কের সামরিক বাহিনীকে আমরা ওখান থেকে প্রত্যাহার করছি না কিংবা সরিয়ে আনছিনা। এটা আপাতত একটা বিরতি। সিরিয়ার ওই এলাকায় একটি সেফ জোন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গত ৯ অক্টোবর থেকে এ অভিযান শুরু করে তুরস্ক। এই সেফ জোনে তুরস্কে থাকার প্রায় ৩৫ লক্ষ সিরিয়াল শরণার্থীর বড় একটি অংশকে পুনর্বাসন করা হবে।
অভিযান শুরুর আগে এলাকাটি সশস্ত্র কুর্দি গোষ্ঠী ওয়াইপিজির অধীনে ছিল যাদেরকে তুরস্ক সন্ত্রাসী গ্রুপ পিকেকের সহযোগী মনে করে। সিরিয়ার সরকারি বাহিনীর পর সবচেয়ে বড় এলাকা ওয়াইপিজির দখলে রয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে তুরুস্ক এ সেফ জোনের কথা বলে আসছিল কিন্তু বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোর কেউ এই বিষয়ে কর্ণপাত করেনি। বরং আমেরিকা ও তার মিত্ররা এই সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সামরিক সহায়তা দিয়েছিল। তুরস্ক ওআইপিজির উত্থানকে সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি মনে করে। এই অঞ্চলে তুরস্কের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে কুর্দি জনগোষ্ঠীর প্রাধান্য বেশি। ঔ এলাকাগুলোতে প্রায় সন্ত্রাসী হামলা হয়ে থাকে।
তুরস্ক সরকার কয়েক মাস পূর্বে সিরিয়া সীমান্তজুড়ে ৬৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ৩২ কিলোমিটার প্রস্থ এই সেফ জোনের মানচিত্র এবং সেখানে কিভাবে শরণার্থীদেরকে পুনর্বাসন করবে তার একটি খসড়া প্রকাশ করে। মানচিত্রটি প্রেসিডেন্ট এরদোগান এবারে জাতিসংঘ অধিবেশনে দেয়া তার বক্তব্য তুলে ধরেছিলেন।পাশাপাশি বিষয়টি নিয়ে কয়েক বছর ধরে তুরস্কের কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে। এই এলাকায় তুরস্ক সামরিক অভিযান শুরুর পর আমেরিকা ব্রিটেন ও জার্মানিসহ কয়টি দেশ তুরস্কের বিরুদ্ধে অবরোধের ঘোষণা দেয়। রাশিয়া এবং ইরান ও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। ইসরাইল ও ফ্রান্স কঠোর হুমকি দিয়েছে। সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের নেতিবাচক মন্তব্য করেছিলেন। সব মিলে উল্লেখযোগ্য কোন দেশকে পাশে পায়নি তুরস্ক। কিন্তু তুরস্ক থেমে থাকেনি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান টার্গেট পূরণ হওয়া পর্যন্ত সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেয়। এদিকে তুর্কি সামরিক বাহিনীর সর্বাত্বক অভিযানে পিছু হটতে বাধ্য হয় কুর্দিরা। একপর্যায়ে ওই এলাকা থেকে আমেরিকার সৈন্য সরানোর ঘোষণা দেয় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
এই বিষয়গুলো নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে আমেরিকা ও তুরস্কের মাঝে কূটনৈতিক নানা টানাপোড়েন চলছিল। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অভিযান বন্ধে কখনো তুরস্ককে হুমকি প্রদান আবার কখনো নরম সুরে প্রেসিডেন্ট এরদোগান কে রাজি করানোর চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট এরদোগান অনড় থাকায় অবশেষে ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে তুরস্কে পাঠিয়ে সমঝোতার চেষ্টা করেন। যার ফলশ্রুতিতে দুই দেশ ঐক্যমতে পৌঁছতে সম্মত হয়। ইশকের দেয়া শর্তগুলো পূরণ হলে গত আট বছর ধরে চলা সিরিয়া যুদ্ধ নাটকীয় মোড় নেবে। তুরস্কের জন্য সবচেয়ে বড় সফলতা হলো তাদের ওই সামরিক অভিযান এবং সেফ জোনের বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেল। বিশ্ব রাজনৈতিক একক ভাবে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে এই ঐতিহাসিক অর্জনটি একদিন আগেও তুরস্কের জন্য অনেকটা কঠিন ছিল যা এখন বাস্তবে রূপ নিলো। বিশ্ব মোড়লদের কাউকে পাশে না পাওয়ার পরেও এত তাড়াতাড়ি বিষয়টি একটা সমাধানের দিকে যাবে এটা তুরস্ক হয়তো চিন্তা করেন নি।
সবকিছু মিলে এই অভিযানের মধ্য দিয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে তুরস্কের নতুন অভিষেক হলো বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান সময়ে কূটনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতা কতটুকু এগিয়েছে এটা তার প্রমান বহন করে। এর পিছনে রয়েছে প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগানের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব এবং দেশের স্বার্থে জনগণের ঐক্য ও দেশ প্রেম। গত কয়েকদিন ধরে তুরস্কের ঐক্য এবং বলিষ্ঠ দেশপ্রেম দেখা গেছে তা বর্ণনা করে শেষ করা যাবেনা সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী প্রায় সবদল অভিযানকে সমর্থন জানিয়েছেন। তুরস্ক সামরিক শক্তিতে কতটুকু এগিয়েছে সেটা এখন বিশ্ব রাজনীতির মোড়লরা বেশ ভাল করে বুঝেছে।
লেখকঃ হাফিজুর রহমান তুরস্কের আঙ্কারা থেকে।

0 Comments